Thursday, April 19, 2018

"উৎসব"- বাঙালির শেকড়ের সাথে গাঁথা



উৎসব শব্দটির মধ্যেই কেমন যেন একটা আনন্দ আর তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে। প্রতিদিন আমরা মূলত নিজ ও নিজের একান্ত আপনজনের জন্যে বাঁচি। কিন্তু উৎসবের সময়ে আমরা বাঁচি সকলের হয়ে সকলের মধ্যে। মিলতে চাই সকলের সাথে। এর মধ্যেই উৎসবের স্বার্থকতা নিহিত। মিলনের তাগিদ থেকেই মানব সমাজে উৎসবের এত রমরমা।
কথায় আছে, বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ। অর্থাৎ বাঙালির প্রকৃতির মধ্যেই একটা উৎসবের আঁচ পাওয়া যায়। বাংলার রয়েছে উৎসবের ইতিহাস। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় নানান ধরণের উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এবং জাতি হিসেবে উৎসব নিয়ে আছে গর্ব করার মতো ইতিহাস। নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের এই বাংলায় রয়েছে নানান ধর্মীয় উৎসব, রয়েছে পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব, পিঠা উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি। এছাড়াও আদিবাসী গোষ্ঠীরা বিজু, বৈসাবিসহ পালন করে আসছে নানা ধরণের উৎসব। কয়েক ধরণের উৎসব সম্পর্কে কিছু আলোচনা করবো।

ধর্মীয় উৎসবসমূহ: যদিও বলা হয়ে থাকে বাংলার মানুষের সাথে উৎসব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর উৎসবের মূল স্বার্থকতা নিহিত থাকে মিলনের মধ্যেই। কিন্তু বাঙালির জাতিগত ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন কথা বলে। প্রশ্ন রয়ে যায় যে, আমাদের উৎসব পার্বণগুলি কি সকল বাঙালিকে নিয়েই? নাকি বিশেষ কোন গোষ্ঠীকে নিয়ে? বাংলার ইতিহাস বর্ণভেদের ইতিহাস। বস্তুত সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রেই কথাটি সত্য। বাংলায় বারো মাসে তের পার্বণ। কিন্তু সেই পার্বণগুলোর ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সবকিছুরই উৎপত্তি বর্ণভেদের সংস্কৃতি থেকে। এই বর্ণভেদই আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।  গোষ্ঠীবদ্ধ শ্রেণীবিভক্ত সমাজ চেতনায় খণ্ডিত উৎসবে। সাম্প্রদায়িক ধর্মের পরিসরে যা মান্যতা পেয়ে যায় জাতীয় জীবনে। আর সেখানেই মানুষে মানুষে মিলনের বদলে গড়ে উঠতে থাকে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর, গোষ্ঠীবদ্ধ শ্রেণীবিভক্ত সাম্প্রদায়িক মানসিকতা। তার ফলে বাঙালির জাতীয় উৎসব নিয়ে আজো প্রশ্ন রয়ে যায়।
বাংলা অঞ্চল বলতে মূলত আমাদের বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গকেই বুঝায়। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা, দুই বাংলাতেই সংস্কৃতি, ভাষাসহ অনেকাংশেই মিল রয়েছে। আর ধর্মীয় উৎসবের কথা উল্লেখ করতে গেলে ওপার বাংলা তথা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আধিক্য থাকার কারণে দেখা যায় বাঙালি হিসেবে ধর্মীয় উৎসব পালনে তারা শারদীয় দূর্গোৎসবকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। আবার এপার বাংলা, তথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে ঈদুল ফিতরকে প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শারদীয় দূর্গোৎসবের ক্ষেত্রে একথা সত্য যে, এটি বাংলার একান্তই নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয়বাহী। এক এক সম্প্রদায়, এক এক গোষ্ঠী, এক এক শ্রেণীর বাঙালি চেতনায় বাঙালির সংস্কৃতির পরিচয় ভিন্ন। আর সেই কারণেই বাংলায় হিন্দুর সংস্কৃতি, মুসলিমের সংস্কৃতি, উচ্চবর্ণের সংস্কৃতি, ধনীর সংস্কৃতি, নির্ধনের সংস্কৃতি প্রত্যেকটি পরস্পর ভিন্ন।
বাংলায় ইসলামের প্রসারের আগেও সেভাবে জাতীয় উৎসবের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। পাল আমলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারকাল ছাড়াও তৎকালীন হিন্দু সমাজে বর্ণপ্রথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো। পরবর্তীতে নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রসারে বাংলার সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরোও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে পরস্পরের মিলন আরোও দুরূহ হয়ে উঠলো আরো সহজেই। তবে সব উৎসবেই বর্ণভেদের বিষয়টা হয়ে উঠে স্পষ্ট। আর এই বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিলো মূলত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উঁচু নিচুর মাপকাঠিতে।
তবে বর্তমানে বাংলায় ধর্মীয় উৎসবগুলো পালিত হয় ভেদাভেদের দেয়ালকে ভেঙ্গেই। সময়ের সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এসেছে বলেই এখানে ঈদ, পূজা, বৌদ্ধ পূর্নিমা, বড়দিন ইত্যাদি উৎসবগুলো পালিত হয়ে আসছে সকলকে কাছে টেনে নেয়ার উদ্দেশ্যকে ঘিরেই।


পহেলা বৈশাখ: বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে পহেলা বৈশাখ নামে পালন করা হয়। একে নববর্ষ হিসেবে এপার এবং ওপার দুই বাংলাতেই অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়। বাংলাদেশে নববর্ষের ঐতিহ্য হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো ২০১৬ সালে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা করা করে।
একসময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিলো ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসনে আরোহনের সময় থেকে। হিজরি চান্দ্রসন এবং বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটিকে প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচয় দেয়া হয়। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময়ে বাংলার কৃষকেরা চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতো। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদেরকে মিষ্টিমুখ করাতো। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।  ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় এবং উৎসবমূখী হয়ে ওঠে। এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিলো হালখাতা, যেটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। এদিনে গ্রামেগঞ্জে ব্যবসায়ীরা তাদের নতুন হিসেবের খাতা খুলতেন। চিরাচরিত এই অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।
বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠান ‘বৈসাবি’ আনন্দমূখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। চাকমারা একে বিজু এবং মারমারা সাংগ্রাই হিসেবে পালন করে থাকে।


নবান্ন উৎসব : নবান্ন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব। বাংলার কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয় তার মধ্যে নবান্ন অন্যতম। “নবান্ন” শব্দের অর্থ “নতুন অন্ন”। নবান্ন উৎসব হলো নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজিত উৎসব। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
হিন্দু রীতিতে নবান্ন একটি পূজাও বটে। নবান্ন উৎসব হিন্দুদের একটি প্রাচীন প্রথা। ১৯৯৮ সন থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব পালন শুরু হয়েছে। এটি বাংলার মানুষের কাছে একটি অতি আপন সংস্কৃতি যা বাঙালি মননের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

No comments:

Post a Comment

পোশাকে-আশাকে বাঙালির ঐতিহ্য

আমরা যখন কোনো বাঙালি নারীর কথা চিন্তা করি, তখনই আমাদের সামনে যে অবয়বটি ফুটে উঠে, সেটি হলো শাড়ি পরা এক নারীর চিত্র। রকমারি মুখরোচক খাবার...